রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে জাল নোট চক্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশ্যেই চলছে ‘এ গ্রেড’ জাল টাকার বিজ্ঞাপন। হোয়াটসঅ্যাপে অর্ডার নেওয়া থেকে শুরু করে কুরিয়ারের মাধ্যমে সরবরাহের আশ্বাস—সবই হচ্ছে প্রকাশ্যে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ‘জাল টাকা’, ‘এ গ্রেড জাল নোট পাইকারি’, ‘টাকার শহর’ ও ‘জাল টাকার বাজার’সহ বিভিন্ন নামে খোলা ফেসবুক পেজে চলছে জাল নোটের বেচাকেনা। এসব পেজে আকর্ষণীয় ভিডিও ও ছবির মাধ্যমে ক্রেতাদের প্রলুব্ধ করা হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) রাতে ‘জাল টাকা’ নামের একটি ফেসবুক পেজে দেওয়া নম্বরে যোগাযোগ করলে এক ব্যক্তি দাবি করেন, তার কাছে ৫০ টাকা থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত সব ধরনের ‘এ গ্রেড’ জাল নোট রয়েছে। তিনি জানান, এক লাখ টাকার জাল নোটের বান্ডিল মাত্র ১২ হাজার টাকায় দেওয়া হবে। তবে অগ্রিম অর্ধেক টাকা পরিশোধ করতে হবে। পরে কুরিয়ারের মাধ্যমে জাল নোট পাঠিয়ে দেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
ওই ব্যক্তি আরও দাবি করেন, তার বাড়ি দিনাজপুরে। শুক্রবার তিনি ঢাকায় এসে গুলিস্তানে সরাসরি দেখা করতে পারবেন এবং সঙ্গে ‘স্যাম্পল’ও থাকবে, যাতে জাল নোটের মান যাচাই করা যায়।
তবে এসব পেজে প্রতারণার অভিযোগও রয়েছে। অনেক ব্যবহারকারী মন্তব্যে অভিযোগ করেছেন, টাকা নেওয়ার পর পণ্য সরবরাহ না করার ঘটনাও ঘটছে।
ফেসবুকে ছড়ানো ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, কার্টনে করে জাল নোট প্যাকেটজাত করা হচ্ছে। কোথাও আবার প্রিন্টারের মাধ্যমে জাল নোট তৈরির দৃশ্য দেখিয়ে ‘এ গ্রেড’ জাল নোটের প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, প্রতি বছরের মতো এবারও ঈদকে সামনে রেখে জাল নোট চক্রগুলো সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে পশুর হাট ও বিপণিবিতানকে কেন্দ্র করে বাজারে জাল টাকা ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছে তারা।
গত ১৩ মে রাজধানীর কমলাপুর, উত্তরা ও গাজীপুরে পৃথক অভিযানে র্যাব ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) প্রায় ৩৪ লাখ টাকার জাল নোট এবং জাল টাকা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধার করে। এ সময় চক্রের পাঁচ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।
ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানান, গ্রেপ্তার হওয়া চক্রটি ঈদ সামনে রেখে তিনটি মেশিনে অবিরাম জাল টাকা ছাপাচ্ছিল। এজন্য তারা একটি প্রেসের কর্মীকেও নিয়োগ দিয়েছিল। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল পশুর হাট ও বিপণিবিতানে জাল নোট ছড়িয়ে দেওয়া।
গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দাবি, ঈদ, পূজা কিংবা বড় উৎসবকে কেন্দ্র করেই সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে জাল নোট চক্র। এজন্য অনলাইন ও অফলাইন—উভয় মাধ্যমে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
এদিকে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, গ্রেপ্তারের পরও অনেক অপরাধী আইনের ফাঁক গলে সহজেই জামিনে বেরিয়ে আসে এবং পুনরায় একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।
সিনিয়র আইনজীবী মঞ্জুর আলম বলেন, জাল নোটসংক্রান্ত মামলার বিচার দ্রুত শেষ করা গেলে অপরাধ দমন সহজ হতো। কিন্তু দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেক মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। তার দাবি, কিছু মামলা ৩০ বছর ধরেও নিষ্পত্তি হয়নি।
তিনি আরও বলেন, সাক্ষী হাজির না হওয়া, সময়ক্ষেপণ এবং আইনি জটিলতার কারণে বিচার কার্যক্রম দীর্ঘ হয়। ফলে অভিযুক্তরা সহজেই জামিন পেয়ে যায়।