টেকনিক্যাল টেক্সটাইল বা কারিগরি বস্ত্র খাত বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শিল্পায়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন জার্মানিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জুলকার নায়েন।
তিনি বলেন, আউসবিলডুং প্রশিক্ষণ, গবেষণা সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের মাধ্যমে বাংলাদেশ এই খাতে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।
তিনি জানান, টেকনিক্যাল টেক্সটাইলের বৈশ্বিক বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে এই খাতের বাজার ৪০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে এবং প্রতিবছর গড়ে ১০ থেকে ১২ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বর্তমানে কৃষি, নির্মাণ, প্রতিরক্ষা, চিকিৎসা, শিল্প কারখানা, পরিবহন, ক্রীড়া ও প্যাকেজিংসহ বিভিন্ন খাতে টেকনিক্যাল টেক্সটাইলের ব্যবহার বাড়ছে। এর মধ্যে অ্যাগ্রোটেক, বিল্ডটেক, ক্লথটেক, জিওটেক, মেডিটেক, মোবিলটেক, প্রোটেক ও স্পোরটেকসহ ১২টি কার্যকরী শ্রেণি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশের সহজলভ্য প্রাকৃতিক তন্তু যেমন পাট, আনারস পাতার তন্তু ও কচুরিপানা থেকে আহরিত ফাইবারকে আরামিড, কার্বন, পলিস্টার ও নাইলনের মতো কৃত্রিম উপাদানের সঙ্গে সমন্বয় করে শক্তিশালী কিন্তু হালকা ও কার্যকর বস্ত্র উৎপাদনের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, কার্যকরী বস্ত্র শিল্প মূলত প্রযুক্তি ও পুঁজিনির্ভর। এ খাতে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন জনশক্তির প্রয়োজন হয়, যারা আধুনিক বয়ন যন্ত্রপাতি, লেমিনেশন প্রযুক্তি, কেমিক্যাল প্রসেস, কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস, প্রসেস কন্ট্রোল ও যন্ত্র রক্ষণাবেক্ষণে পারদর্শী।
জার্মানিতে এই খাতে প্রশিক্ষণ ও চাকরির সুযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশের আগ্রহী শিক্ষার্থীরা আউসবিলডুং কর্মসূচির মাধ্যমে টেকনিক্যাল টেক্সটাইল খাতে দক্ষতা অর্জন করতে পারেন। এ জন্য ন্যূনতম বি-ওয়ান মানের জার্মান ভাষাজ্ঞান প্রয়োজন। বিশেষ করে মেকানিক্যাল বা টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিপ্লোমাধারীরা অগ্রাধিকার পেতে পারেন। তবে আবেদনকারীদের জার্মানির ANABIN ডাটাবেজ থেকে শিক্ষাগত সনদের সমতুল্যতা যাচাই করে আবেদন করার পরামর্শ দেন তিনি। কারণ, বাংলাদেশের কিছু ডিপ্লোমা সনদকে অনেক সময় অতিরিক্ত যোগ্যতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা আবেদন প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
জার্মানিতে অটোমোটিভ, মেডিকেল ও জিওটেক্সটাইল খাতে টেকনিক্যাল টেক্সটাইলভিত্তিক।
আউসবিলডুংয়ের সুযোগ রয়েছে উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত বলেন, এই খাতে বিদেশিদের আগ্রহ তুলনামূলক কম হওয়ায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ বেশি।
তিনি জানান, জার্মানিতে টেক্সটাইল প্রোডাকশন মেকানিক, টেক্সটাইল ও ফ্যাশন টেইলর, টেক্সটাইল প্রোডাক্ট ডিজাইনার, টেক্সটাইল ল্যাবরেটরি অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং টেক্সটাইল প্রোডাক্ট ফিনিশারসহ বিভিন্ন পেশায় আউসবিলডুং করা যায়।
এছাড়া ট্রিগেমা, টেক্সটিলাকাডেমি এনআরডব্লিউ, ইনোবেল্ট এবং Ausbildung.de-এর মতো প্রতিষ্ঠান ও প্ল্যাটফর্মে প্রশিক্ষণ ও চাকরির সুযোগ রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
রাষ্ট্রদূত বলেন, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল খাতের প্রযুক্তি ও গবেষণা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। তাই আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও প্রযুক্তি অর্জনে বাংলাদেশের শিক্ষার্থী ও উদ্যোক্তাদের সক্রিয় হতে হবে।
তিনি জার্মানির ডিআইটিএফ (DITF) গবেষণা প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, প্রতিষ্ঠানটি মোটরগাড়ি, বিমান, চিকিৎসা সরঞ্জাম, সুরক্ষামূলক পোশাক, সেন্সরভিত্তিক স্মার্ট টেক্সটাইল, বায়োপলিমার এবং কার্বন ফাইবার প্রযুক্তি নিয়ে অত্যাধুনিক গবেষণা পরিচালনা করছে। সম্প্রতি তাদের উদ্ভাবিত NUO FlexHolz এবং FormLig প্রযুক্তি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছে।
বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি অগ্নি-প্রতিরোধী জৈব ফাইবার, ই-টেক্সটাইল, বায়োমেটেরিয়াল, টেক্সটাইলভিত্তিক সেন্সর, কার্বন ফাইবার উৎপাদন এবং মেডিকেল ইমপ্লান্ট নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
সম্প্রতি Frankfurt-এ অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক টেকনিক্যাল টেক্সটাইল মেলায় অংশ নিয়ে রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জুলকার নায়েন জার্মানির বিভিন্ন কোম্পানি ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল শিল্পের সম্ভাব্য সহযোগিতা নিয়ে মতবিনিময় করেন।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, দক্ষ মানবসম্পদ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, গবেষণা সহযোগিতা এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে টেকনিক্যাল টেক্সটাইল খাত বাংলাদেশের শিল্প অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে।