মুসলিম বিয়েতে দেনমোহর বাকি বা ‘ডেফার্ড’ রাখার কোনো সুযোগ নেই উল্লেখ করে হাইকোর্ট বলেছে, বিয়ের সময় বা পরপরই এটি পরিশোধ করা স্বামীর জন্য বাধ্যতামূলক।
দেনমোহর বাকি রাখাকে ‘সামাজিক অপপ্রথা’ আখ্যায়িত করে আদালত বলেছে, দীর্ঘদিন পর বকেয়া দেনমোহর পরিশোধের ক্ষেত্রে টাকার মূল্যস্ফীতি সমন্বয়ে একটি আইনি কাঠামো থাকা উচিত।
একইসঙ্গে বিয়ের দীর্ঘ সময় পর বিলম্বিত দেনমোহর পরিশোধের ক্ষেত্রে টাকার অবমূল্যায়ন ও মূল্যস্ফীতি বিবেচনা করে একটি সমন্বিত নীতিমালা কেন প্রণয়ন করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছে আদালত।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফাহমিদা আখতারের করা এক রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে সোমবার (১৩ জুলাই) বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রুল জারি করেন।
আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দুই সচিব (আইন ও বিচার বিভাগ এবং লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ), মহিলা ও শিশু বিষয়ক সচিব, ধর্ম সচিব, স্বরাষ্ট্র সচিব এবং আইন কমিশনের চেয়ারম্যানকে এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
এর আগে গত ৫ জুলাই নিজে বাদী হয়ে (ইন পারসন) রিট আবেদন দায়ের করেন আইনজীবী ফাহমিদা আখতার।
আবেদনে ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ১০ ধারার অধীনে একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা প্রণয়নের আরজি জানানো হয়।
এর উদ্দেশ্য হিসেবে বলা হয়— বিয়ের দীর্ঘ সময় পর দেনমোহর আদায়ের ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি ও টাকার অবমূল্যায়ন বিবেচনা করে একটি সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি, নীতি ও মূল্যায়ন কাঠামো নির্ধারণ করা।
এ ছাড়া আবেদনে সংবিধানের ৭, ২৭, ২৮ ও ৩১ অনুচ্ছেদে বর্ণিত মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নের কথাও উল্লেখ করা হয়।
আদালতের আদেশের পর রিটকারী আইনজীবী ফাহমিদা আখতার বলেন, ‘আমাদের ধর্ম ও আইন অনুযায়ী বিয়ে হচ্ছে একটি ‘সিভিল কন্ট্রাক্ট’ এবং দেনমোহর হচ্ছে এর ‘কনসিডারেশন’ (বিনিময়)। দেনমোহর বিয়ের সময় এবং বিয়ের পর পরই পরিশোধ করে দেওয়া স্বামীর ওপর বাধ্যতামূলক। আমাদের ধর্মে ও আইনে এটিকে এতই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে যে, দেনমোহর স্বামীর ওপর এক ধরনের ঋণ হিসেবে বর্তায়।’
দেনমোহর আদায়ের অধিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘স্বামী যদি দেনমোহর পরিশোধ না করে মারাও যান, তবে স্ত্রী তার স্বামীর সম্পত্তি থেকে সেই টাকা আদায় করতে পারবেন। এমনকি প্রাপ্য দেনমোহর পাওয়ার আগে স্ত্রী মারা গেলে তার উত্তরাধিকারীরাও এই দেনমোহরের টাকা স্বামীর কাছ থেকে দাবি করতে বা মামলা করতে পারবেন।’
প্রচলিত প্রথার সমালোচনা করে এই আইনজীবী বলেন, ‘আইনে সুনির্দিষ্ট কিছু বলা না থাকলে দেনমোহরের পুরো টাকা তাৎক্ষণিক (প্রম্পট) পরিশোধযোগ্য হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু সমাজে দেখা যায়, কিছু পরিমাণ টাকা ‘উসুল’ দেখিয়ে বাকিটা বিলম্বিত (ডেফার্ড) দেনমোহর হিসেবে কাবিননামায় দেখানো হয়। বিলম্বিত দেনমোহরটা হচ্ছে, ডিভোর্সের পর অথবা কেউ মারা গেলে এটি পরিশোধের বাধ্যবাধকতা আসে।’
টাকার অবমূল্যায়নের বিষয়টি উদাহরণ দিয়ে ফাহমিদা আখতার বলেন, ‘দীর্ঘ সময় পর দেনমোহর পরিশোধের কারণে টাকার মান অনেক কমে যায়। উদাহরণস্বরূপ, ২০ বছর আগে কারও দেনমোহর ২ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হলো। ২০ বছর পর বিবাহবিচ্ছেদের সময় বাকি থাকা ১ লাখ টাকা পরিশোধ করা হলে, সেই টাকার আর্থিক মূল্য আগের মতো থাকে না। ফলে বিয়েতে নারীদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যে আইনি উদ্দেশ্য, তা আর রক্ষা হয় না। এজন্যই টাকার মান সমন্বয় করে দেনমোহর পরিশোধের গাইডলাইন চেয়েছি।’
আদালতের পর্যবেক্ষণের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘দেনমোহর আসলে বিলম্বিত বা বাকি রাখার বিষয়ই না। আইন অনুযায়ী বিয়ের সময় বা পরপরই এটি দেওয়া স্বামীর ওপর বাধ্যতামূলক। কিন্তু সামাজিক অপপ্রথার কারণে যেহেতু তা দেওয়া হচ্ছে না, তাই এটিকে আইনি কাঠামোর মধ্যে আনা উচিত।’
পাশাপাশি দেনমোহর সর্বাবস্থায় পরিশোধের বিষয়ে আইনি সচেতনতা বাড়ানোর ওপরও জোর দিয়েছেন আদালত, জানান এই আইনজীবী।
সমাজে অনেক সময় লোক দেখানোর জন্য অস্বাভাবিক দেনমোহর নির্ধারণ করা হয়— শুনানিতে এ বিষয়টিও ওঠে আসে। এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে ফাহমিদা বলেন, ‘কাবিননামায় স্বাক্ষরের সময় উভয় পক্ষ বসে কথা বলেই সই করেন। এখানে সাধারণত জোর-জবরদস্তি থাকে না। রাজি না হলে সই করবেন না। তবে স্বামীর সামর্থ্য অনুযায়ী দেনমোহর নির্ধারণের বিষয়টিও নীতিমালায় উঠে আসবে বলে আমরা আশা করি।’