আয়নাঘরে রাত হলেই তওবা করে মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকতাম: ব্যারিস্টার আরমান

আয়নাঘরে রাত হলেই তওবা করে মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকতাম: ব্যারিস্টার আরমান

নিজস্ব প্রতিবেদক : January 22, 2026

ঘুম হওয়ার পর আয়নাঘরে বন্দি থাকার সময়গুলো স্মৃতিচারণ করেছেন জামায়াত নেতা প্রয়াত মীর কাশেম আলীর ছেলে ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম (আরমান)। লোমহর্ষক বর্ণানায় তিনি বলেছেন, ‘প্রতি রাতে তওবা করে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাকতাম।’

বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর মিরপুর–১০ নম্বর আদর্শ স্কুল মাঠে আসন্ন জাতীয় সংসদ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামীর আমীরের জনসভায় তিনি নিজে বন্দি জীবন ও নির্যাতনের স্মৃতিচারণ করেন। তিনি ঢাকা-১৪ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লড়ছেন।

ব্যারিস্টার মীর আহমদ বলেন, ‘যে ঘরে আমি ছিলাম, সেখানে আমি বুঝতেও পারতাম না বাইরে দিন নাকি রাত। আমাকে বলা হতো না কোথায় আটকে রাখা হয়েছে, আজকে কী তারিখ।’

তিনি বলেন, ‘পিতার ফাঁসির কয়েকদিন আগে আমাকে অন্ধকার ঘরে চোখ বন্ধ করে হাত বেঁধে রাখা হয়। তখন আমি ভাবছিলাম, সংবিধান আছে, গ্রেফতারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করতে হবে, হয়তো মুক্তি হবে।’

‘কিন্তু ২৪ ঘণ্টা, দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর- সব কেটে গেল। তখন বুঝতে পারলাম যে আমি মানবাধিকার কর্মী হিসেবে যেই ঘুমের বিরুদ্ধে কথা বলতাম, নিজে সেই ঘুমের শিকার হয়েছি‘, যোগ করেন তিনি।

ব্যারিস্টার মীর আহমদ আরও বলেন, ‘পিতার ফাঁসির আগে তিনি আমার জন্য যে উপদেশ দিয়েছিলেন, আমি জানতে পারিনি। আমার পিতা ফাঁসির সামনে আমাকে রেখে গেলেন- সন্তান হিসেবে এতটুকু জানার অধিকার আমার ছিল না।’

‘আমি ভাবতাম হয়তো আজ রাতে তারা আমাকে হত্যা করবে। তাই রাত হলে তওবা করে প্রস্তুত থাকতাম। যদি আমাকে হত্যা করে, আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করবেন’, বলেন তিনি।

ব্যারিস্টার মীর আহমদ আরও বলেন, ‘আমি পরে জানতে পারি, আমাদের সন্তানরা আমাদের বাচ্চা ছেলেমেয়ে জীবন দিয়ে বাংলাদেশের মাটি থেকে ফ্যাসিবাদকে বিতাড়িত করেছে। ৫ই আগস্ট যখন তারা মাঠে নেমেছিল, তখন তারা জানত না আজই তাদের বিদায় হবে। তারা মোবাইলে নাম, ঠিকানা, ব্লাড গ্রুপ রেখে নেমেছিল। তারা চেয়েছিল শুধু দাবি আদায় নয়, বরং জীবন দিতে রাজি ছিল।’

জামায়াতের এই প্রার্থী বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের অন্ধকার থেকে দেশকে মুক্ত করে নতুন বাংলাদেশ গড়াই এখন সময়ের সর্বোচ্চ দাবি।’

তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালের রক্তের সংগ্রামের পরও দেশের মানুষ সঠিক স্বাধীনতা পাননি, তাই বর্তমানে যে দুঃশাসন ও নির্যাতনের অন্ধকার বিরাজ করছে, তা থেকে উত্তরণে নতুন নেতৃত্বের বিকল্প নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন আমরা যে দ্বিতীয় স্বাধীনতা পেয়েছি, তা শুধু একটি ভোটের জন্য নয়। তারা চেয়েছে একটি নতুন বাংলাদেশ। মানুষ পুরনো রাজনীতিতে, পেশিশক্তির প্রভাবে, কালো টাকার প্রভাবে, দুর্বৃত্তদের রাজনৈতিক ক্ষমতায় নিয়ন্ত্রণে হাপিয়ে উঠেছে। তারা নতুন নেতৃত্ব দেখতে চায়- যাদেরকে টাকা দিয়ে কেউ কিনতে পারবে না।

‘এই নেতৃত্বই দিতে পারে আমাদের প্রাণপ্রিয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি হৃদয় আক্রান্ত হওয়ার পরও বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও দেশে থেকে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। যেখানে অধিকাংশ মানুষ দেশের বাইরে চিকিৎসা করতে পারে না, সেখানে তিনি বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা নেবেন কীভাবে- এমন প্রশ্নই ওঠে। তিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মানুষের চিকিৎসা করেছেন।’

ব্যারিস্টার আরমান বলেন, ‘ফ্যাসিবাদের কিছু মাথা পালিয়ে গেছে, কিন্তু প্রশাসনের ভিতরে এখনও ফ্যাসিবাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বসে আছে। দেশ নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ বারবার দেখিয়েছে, যখন ছাত্রজনতা মাঠে নামে, তখন পর্বতসম শক্তিও বিলীন হয়ে যায়। যত ষড়যন্ত্রই করা হোক, জনগণ রাস্তায় নেমে আবারও বিজয় নিশ্চিত করবে।’

নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘যেভাবে ৫ই আগস্ট সবাই মাঠে নেমেছিল, যেভাবে সন্তানেরা, পিতা-মাতা সবাই দেশপ্রেমে এগিয়ে এসেছিল- এখন সময় এসেছে আবার একত্রিত হওয়ার। সকল ভেদাভেদ ভুলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে নতুন বাংলাদেশের জন্য রাস্তায় নামার। সেই দিন হচ্ছে ১২ ফেব্রুয়ারি। ১২ ফেব্রুয়ারি সবাই রাস্তায় থাকবে এবং এক কঠোর শপথ করবে- ‘হ্যাঁ’ ভোটের বিজয় নিশ্চিত করে নতুন বাংলাদেশের সূচনা করেই আমরা ঘরে ফিরবো।’

Share This