কম্বোডিয়ায় উচ্চ বেতনের চাকরির লোভ দেখিয়ে এক নারীকে মানবপাচার, পাসপোর্ট ও অর্থ জোরপূর্বক আত্মসাৎ, শারীরিক-মানসিক নির্যাতন এবং অবৈধ কর্মকাণ্ডে বাধ্য করার অভিযোগে সংঘবদ্ধ মানবপাচার চক্রের মূলহোতা মো. রুবেলকে (২৯) গ্রেফতার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
সিআইডির মানবপাচার শাখা (টিএইচবি) গত ২১ জুলাই ফরিদপুরের চরভদ্রাসন থানা এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করে। তিনি রাজবাড়ী জেলার কালুখালী উপজেলার খাগজানা গ্রামের বাসিন্দা।
সিআইডি জানায়, আর্থিক সংকটে থাকা ভুক্তভোগী এক নারী স্থানীয় একটি এনজিও থেকে ঋণ নেওয়ার সময় ওই প্রতিষ্ঠানের কর্মী রুবেলের সঙ্গে পরিচিত হন। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে রুবেল তাকে কম্বোডিয়ায় কাস্টমার কেয়ার সার্ভিসে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখান এবং বিদেশে পাঠানোর আশ্বাস দেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, বিদেশে পাঠানোর ব্যয় বহনের সামর্থ্য না থাকায় রুবেল ভুক্তভোগীকে এনজিও থেকে এক লাখ টাকা ঋণ নিতে উৎসাহিত করেন। ঋণের অর্থ হাতে পাওয়ার পরই তিনি ওই টাকা ও ভুক্তভোগীর পাসপোর্ট নিজের কাছে রেখে দেন। পরে ভিসা ও চাকরির বিভিন্ন খরচের কথা বলে ধাপে ধাপে আরও অর্থ আদায় করেন। ধারদেনা করে ভুক্তভোগী তার দেওয়া ব্যাংক হিসাবে দুই লাখ টাকা জমা দেন। সব মিলিয়ে বিদেশে পাঠানোর নামে তার কাছ থেকে প্রায় চার লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।
এরপর ২০২৫ সালের আগস্টে ভিসা ও বিমানের টিকিট দিয়ে ভুক্তভোগীকে কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর চক্রের সদস্যরা তার পাসপোর্ট, মোবাইল ফোন ও সঙ্গে থাকা অর্থ জোরপূর্বক নিয়ে নেয়। পরে তাকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর করে অনিচ্ছাকৃতভাবে কাজ করতে বাধ্য করা হয় এবং তার উপার্জনের পুরো অর্থ আত্মসাৎ করা হয়।
শুধু তাই নয়, একপর্যায়ে তাকে বিভিন্ন অবৈধ কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়। এতে অস্বীকৃতি জানালে তার ওপর চালানো হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। দেশে ফিরে যেতে চাইলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় এবং অন্য দালালদের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার ভয় দেখানো হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অবশেষে দীর্ঘ নির্যাতনের পর ভুক্তভোগী দেশে ফেরার সুযোগ পান। ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টার এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক ও মানবিক সংস্থার সহযোগিতায় তিনি গত ১ জুলাই ২০২৬ বাংলাদেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে আইনি সহায়তা নিয়ে মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন।
মামলার তদন্তে ভুক্তভোগীর বক্তব্য, সাক্ষ্য-প্রমাণ, নথিপত্র এবং গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করে সিআইডির মানবপাচার শাখা চক্রের মূলহোতা রুবেলকে শনাক্ত করে। পরে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেফতার করা হয়। আদালতে হাজির করার পর তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে।
সিআইডি জানিয়েছে, গ্রেফতার ব্যক্তির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মানবপাচার চক্রের অন্য সদস্য, অর্থ লেনদেনের নেটওয়ার্ক, বিদেশে অবস্থানরত সম্ভাব্য ভুক্তভোগী এবং দেশি-বিদেশি সহযোগীদের শনাক্তে তদন্ত জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে এই চক্রের মাধ্যমে আরও কোনো বাংলাদেশি একই ধরনের প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে সিআইডি বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভনে বিভ্রান্ত না হয়ে সরকার অনুমোদিত বৈধ ও নিরাপদ প্রক্রিয়ায় বিদেশ যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। পাশাপাশি বিদেশে পাঠানোর নামে প্রতারণা, মানবপাচার, জিম্মি বা নির্যাতনের কোনো তথ্য পাওয়া গেলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অথবা সিআইডিকে অবহিত করার অনুরোধ জানিয়েছে।