চলমান শ্রমিক অসন্তোষ ও আন্দোলনের স্থায়ী সমাধানে সরকারের কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি তৈরি পোশাকশিল্পকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে বলে মন্তব্য করেছে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)। দলটি বলছে, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানও রক্ষা করতে হবে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) রাজধানীর বিজয়নগরে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু।
মঞ্জু বলেন, শ্রমিকের অধিকার ও পোশাকশিল্পের স্বার্থ পরস্পরবিরোধী নয়। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিল্পে কর্মসংস্থান ও উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখতে হবে। তবে শ্রমিকের অধিকার ও শিল্পের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে এর দায় সরকারকেই নিতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ তৈরি পোশাকশিল্প থেকে আসে এবং প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক সরাসরি এ খাতের সঙ্গে যুক্ত। ফলে এ খাতের সংকট শুধু মালিকদের ব্যবসায়িক বিষয় নয়; এর সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতি ও লাখ লাখ পরিবারের জীবিকা জড়িত।
দ্রব্যমূল্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ও যাতায়াত ব্যয় বৃদ্ধির কারণে বর্তমান মজুরিতে শ্রমিকদের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে উল্লেখ করে মঞ্জু বলেন, শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্যে রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। উৎপাদন, জ্বালানি ও অর্থায়ন ব্যয় বাড়লেও আন্তর্জাতিক ক্রেতারা অনেক ক্ষেত্রে পণ্যের ন্যায্য মূল্য দিচ্ছেন না। ফলে মজুরি বৃদ্ধির পুরো চাপ শুধু কারখানা মালিকদের ওপর দিলে বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলো সংকটে পড়তে পারে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ও ক্রেতাদেরও শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার দায় নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শ্রমিক আন্দোলনে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ভূমিকার সমালোচনা করে মঞ্জু বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের নয়। পুলিশ, শিল্প পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের লাঠিসোঁটা নিয়ে রাজপথে নামার ঘটনা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করে এবং নতুন সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করে।
বিএনপির বিরোধী দলে থাকার সময় নিরপেক্ষ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবির প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, এখন তাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিতে হবে।
মজুরি বোর্ড গঠন ও সরকারের উদ্যোগে বিলম্বেরও সমালোচনা করেন মঞ্জু। তিনি বলেন, ১৫ অক্টোবর মজুরি বোর্ড গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে বোর্ড গঠন করতে ১ নভেম্বর পর্যন্ত সময় লেগেছে এবং প্রথম সভা হয়েছে ৪ নভেম্বর। শ্রমিক অসন্তোষ বাড়ার সময়ে কার্যকর আলোচনা ও সমাধানের উদ্যোগে বিলম্ব সরকারের সংকট মোকাবিলার প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
গাজীপুরে শ্রমিক তৌফিক হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়ে মঞ্জু বলেন, ওই ঘটনায় কারা দায়ী, শ্রমিকদের ওপর হামলায় কারা জড়িত এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যথাযথ দায়িত্ব পালন করেছে কি না—তা তদন্ত করে জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। আন্দোলনে কোনো রাজনৈতিক দলের অনুপ্রবেশ, উসকানি, ভাঙচুর বা নাশকতার অভিযোগ থাকলে সেগুলোরও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আব্বাস ইসলাম খান নোমান দলের পক্ষ থেকে কয়েকটি দাবি তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে বর্তমান মজুরি বোর্ডকে কার্যকর করে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে নতুন মজুরি কাঠামোর সুপারিশ চূড়ান্ত করা এবং শ্রমিকদের ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়নযোগ্য মজুরি বৃদ্ধির রোডম্যাপ ঘোষণা করা।
প্রয়োজনে ধাপে ধাপে মজুরি বাড়ানো হলেও প্রতিটি ধাপের পরিমাণ ও কার্যকর হওয়ার তারিখ নির্ধারণের দাবি জানায় দলটি।
ব্যারিস্টার নোমান বলেন, মজুরি কমিয়ে বা আন্দোলন দমন করে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। একইভাবে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার মাধ্যমেও শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। এ জন্য ন্যায়ভিত্তিক মজুরি, দায়িত্বশীল মালিকানা, দক্ষ ও উৎপাদনশীল শ্রমশক্তি এবং জবাবদিহিমূলক সরকার প্রয়োজন।
এবি পার্টি বলছে, সংকট তৈরি হওয়ার পর প্রতিক্রিয়া দেখানোর পরিবর্তে আগেই কার্যকর সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে। শ্রমিকের মর্যাদা, শিল্পের সুরক্ষা ও জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত জাতীয় পোশাকশিল্প ও শ্রমনীতি প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।